এইচটি বাংলা ডেস্ক : জাপানে বসবাসরত প্রবাসী মুসলিমদের নৈতিক ও চারিত্রিক মানোন্নয়ন এবং স্থানীয় জাপানিজ সমাজের কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ সঠিকভাবে তুলে ধরার প্রত্যয়ে ইসলামিক মিশন জাপান (IMJ) আয়োজিত কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন ও শিক্ষা শিবির ২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সাইতামা প্রিফেকচারের কশিগায়া শহরের গামো হলে আয়োজিত দিনব্যাপী এই সম্মেলনটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা ও দিকনির্দেশনামূলক প্ল্যাটফর্ম।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এবং আমীরে জামায়াতের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামিক মিশন জাপানের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ মাওলানা ছাবের আহমদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান প্রবাসী বাংলাদেশিদের দায়িত্ব ও সম্ভাবনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাপান এমন একটি দেশ, যেখানে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং সময়নিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই দেশ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কর্মসংস্কৃতি এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জাপান বিশ্বের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, জাপানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু নিজেদের জীবনের মান উন্নয়নের সুযোগই পাচ্ছেন না, বরং তারা দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। দক্ষতা অর্জন, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ এবং সেসব অভিজ্ঞতা দেশে কাজে লাগানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।।”
আমীরে জামায়াত বলেন, “জাপান বাংলাদেশের একটি অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দায়িত্বশীল আচরণ, সততা ও নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।”
সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সাম্প্রতিক ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই পরিবর্তনের ধারাকে টেকসই ও সফল করতে দেশের ভেতরের পাশাপাশি প্রবাসীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রবাসে অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সম্পদ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।”
বিশেষ অতিথি সাইফুল আলম খান মিলন, এমপি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির বাস্তবতা তুলে ধরে ঐক্যের অপরিহার্যতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিভাজন ও মতপার্থক্য ভুলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। “ইটের গাঁথুনির মতো দৃঢ় ঐক্যই আমাদের শক্তি” এ কথা উল্লেখ করে তিনি জাপানে বসবাসরত বিভিন্ন পেশা ও স্তরের বাংলাদেশিদের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার আহ্বান জানান। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ভাষাশিক্ষার্থী, চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
সম্মেলনের সূচনায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে পরিবেশে এক আধ্যাত্মিক আবহের সৃষ্টি হয়। প্রথম অধিবেশনে দারসুল কুরআন পেশ করেন ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, এম.পি। তিনি সূরা মায়েদাহ'র ৫৪ থেকে ৫৬ নম্বর আয়াতের আলোকে বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অটল ভালোবাসা,মুমিনদের প্রতি গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সত্যের পথে অবিচল থাকা এসব গুণই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয় বহন করে। তিনি আরও বলেন, নিন্দা-সমালোচনাকে উপেক্ষা করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অটল থাকাই ঈমানদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা অর্জনের মধ্য দিয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চূড়ান্ত সফলতা লাভ সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে হাফেজ মাওলানা ছাবের আহমদ বলেন, “আমাদের দায়িত্ব শুধু সংগঠনের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাপানে বসবাসরত সমগ্র প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের কল্যাণে কাজ করা। তিনি বলেন, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয় হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সংকটে এগিয়ে আসার মানসিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি আদর্শ কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
দিনব্যাপী এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে এক আবেগঘন পরিবেশে। দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।