চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি এলএনজিবাহী পুরাতন জাহাজ কাটিংকালে বিষাক্ত গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই সহোদরসহ নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৩০ শ্রমিক। তবে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারী স্টেশন রোড সমুদ্র উপকূলে মো: লোকমানের মালিকানধীন ফেরদৌস গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
সকাল ৮টায় এ ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকাজে বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেয়নি এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালায় বলে স্থনীয় এলাকাবাসীরা জানান। যার কারণে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেছে বলে দাবি করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি লোকমানের মালিকানাধীন ফেরদৌস গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি পুরাতন এলএনজিবাহী জাহাজ কাটিং করার জন্য আনা হয়। সেটি কাটিং করতে যান ইয়ার্ডে কর্মরত প্রায় ৩৫ জন শ্রমিক।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আজগর জানান, শ্রমিকরা তখন জাহাজের ভেতরে ঢুকে কাটিং করার শুরুতে গ্যাসের টাঙ্কি থেকে কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃস্বরণ হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে সেটির বিষ্ফোরণ ঘটে। কাটিংকালে কোনো সেফটি না নেয়াতে সবাই আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই ৩ শ্রমিক নিহত হন। খবর পেয়ে এলাকাবাসী অন্য শ্রমিকদেরকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করলে সেখানে দুপুরে ৫ জন এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে সন্ধ্যার দিকে আরো এক শ্রমিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে চমেক হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা: ইশতিয়াক আহম্মেদ জানান।
এ ঘটনায় মারা যাওয়া শ্রমিকরা হলেন- মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩), হাবিবুর রহমান (৫১), পলাশ দাশ (৩৫), সানি দাশ (২৩), মোহাম্মদ খোকন মিয়া (২৩) ও মো: শরীফ। আর দুর্ঘটনায় আহতরা বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফের দাবি- শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সকাল ১০টার সময় স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজে একটি ট্যাঙ্ক লিকেজ হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় বহিরাগত কিছু লোক তা দেখতে আসে। এ সময় জমে থাকা গ্যাসে কয়েকজনের মৃত্যু ও কয়েকজন আহত হন।
স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম মাহমুদ বলেন, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুরু হয়। তারা কারখানা এলাকায় গেলে দেখতে পান, অসুস্থ কিছু লোককে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। এরপর জাহাজের ভেতরে কয়েকজন মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহত দুই সহোদর মনছুর ও নাছিরের ভগ্নিপতি মহিউদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগেও কারখানায় কাজ করতে কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মনছুর ও নাছির। এমনকি চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন তারা।
নিহত খোকনের চাচা ও কারখানাটির সাবেক শ্রমিক আঙ্গুর আলী বলেন, সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে পান। বিস্ফোরণের পর শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন। গ্যাসের কারণে প্রথম দিকে ভেতরে ঢোকাও সম্ভব হচ্ছিল না।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: ফখরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতদের পরিবারকে বিএসবিএ এর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে দেয়া হবে।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন জানান, বিস্ফোরণ ও বিষক্রিয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।