লুৎফুর রহমান শাওন, সিলেট ব্যুরোঃ
🟢হাবিব উল্লাহ তালুকদার একজন প্রজাহিতৈষী সমাজনেতা ও দানশীল শিক্ষানুরাগীর সংক্ষিপ্ত জীবনী: তিনি তৎকালীন সিলেট জেলার (বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার) ছাতক উপজেলার পৌর শহরের অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী তাতিকোনা গ্রামের একজন প্রখ্যাত সমাজনেতা, সালিশী ব্যক্তি ও দানশীল জমিদার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি একজন উজ্জ্বল ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
🟢 জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: তিনি ১৮৬৫ সালে একটি সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মকালে এ অঞ্চল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। প্রতিকূল সেই সময়েও তিনি জ্ঞান, সততা ও নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর পিতা হাজী মোহাম্মদ কামিল তালুকদার পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে অবস্থানকালে ইন্তেকাল করেন। তখন হাবিব উল্লাহ তালুকদারের বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। অল্প বয়সেই তাঁকে পিতার রেখে যাওয়া বিপুল ভূসম্পত্তি ও চুনাপাথর পোড়ানোর বৃহৎ ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়।
🟢 সমাজজীবন ও নেতৃত্ব: একই গ্রামে ৬/৭ জন প্রভাবশালী হিন্দু জমিদারের মধ্যখানে একজন মুসলিম জমিদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখা এবং পরবর্তীতে সরপঞ্চের দায়িত্ব পালন করা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তবুও তিনি দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী ও ন্যায়পরায়ণ সালিশী ব্যক্তিত্ব। বৃহত্তর ছাতক থানাজুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি ঘোড়ায় চড়ে উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে সালিশ বিচারে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর আর্থিক সামর্থ্যের কারণে অনেক প্রজাকে বিনা পয়সায় কবুলিয়াত প্রদান করতেন যার সাক্ষ্য বিভিন্ন জবানবন্দিতে পাওয়া যায়।
🟢 শিক্ষা ও ধর্মীয় অবদান: হাবিব উল্লাহ তালুকদারের ছিল ৪ জন পুত্র ও ৩ জন কন্যা। প্রত্যেককেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর দুই পুত্র হাজী মুহাম্মদ তোতা মিয়া তালুকদার ও নজিব আলী তালুকদারকে সিলেট শহরে হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর খাদেম, সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুফতি বাড়িতে লজিং রেখে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। জীবদ্দশায় তিনি বহু ভূসম্পত্তি মসজিদ ও মাদ্রাসার নামে দান করে যান, যা তাঁর ধর্মীয় অনুরাগ ও দানশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
🟢 উত্তরাধিকার ও প্রতিষ্ঠান স্থাপন: তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর, ২০০২ সালে তাঁর উত্তরাধিকারীগণ তাঁর নামানুসারে হাবিব উল্লাহ জামিয়া ইসলামীয়া মাদ্রাসা, তাতিকোনা, ছাতক প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত মাদ্রাসার উদ্বোধন করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, ঢাকার খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছাতক থানার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান, ছাতক পৌরসভার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহিদ মজনু, অধ্যক্ষ মাওলানা আনোয়ার শাহ কিশোরগঞ্জী, আলহাজ্ব আবরু মিয়া তালুকদার, আলহাজ্ব আতাউর রহমান তালুকদার, আলহাজ্ব আব্দুর রহিম, ছোরাব আলী মেম্বার, আলহাজ্ব সৈয়দ তিতুমীরসহ তাতিকোনা, বৌলা, মোগলপাড়া, চররেবন্দ, মন্ডলীভোগসহ আশপাশের এলাকার নেতৃস্থানীয় মুরব্বিয়ান ও সর্বস্তরের জনগণ। বর্তমানে উক্ত মাদ্রাসার পাশে তাঁর নামে একটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা চালুর উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যেখানে আশপাশের দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীরা দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
🟢 উত্তরসূরিদের অবদান: তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হাজী তোতা মিয়া তালুকদার পরবর্তীতে অত্র অঞ্চলের সরপঞ্চ ছিলেন। নাতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ আতাউর রহমান তালুকদার ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম ইউপি নির্বাচনে ছাতক ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁর স্ত্রী সামসুন নাহার ২০১৫ সালে সিলেট শহরের শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট এন.জে.এল সেন্টার থেকে ‘গর্বিত-মাতা’ পদক লাভ করেন। ২০১৪ সালে তাঁর আরেক নাতি এডভোকেট রেজাউল করিম তালুকদার ছাতক উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পরও দ্বিতীয় অবস্থান দেখানো হয়েছিল। বর্তমানেও তাঁর উত্তরাধিকারীদের অনেকেই দেশ-বিদেশে শিক্ষা, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও বিভিন্ন দপ্তর ও সংগঠনে নিষ্ঠার সঙ্গে অবদান রেখে চলেছেন।
🟢 ইন্তেকাল: এই মহতী সমাজসেবক ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পরও তাঁর কর্ম, দানশীলতা ও আদর্শ আজও এলাকাবাসীর স্মৃতিতে ও প্রতিষ্ঠানে জীবন্ত হয়ে আছে।