শিরোনাম
কালিহাতীতে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ টাঙ্গাইলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণে মেধাবৃত্তির চেক বিতরণ সাপাহারে অ’বৈধ কারেন্ট ও রিং জাল পু’ড়িয়ে ধ্বং’স সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধানের মাতার ইন্তেকালে পাটগ্রাম প্রেসক্লাবের শোক বিহারে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক মিডিয়া সামিট-২০২৬ শক্তিশালী টাইফুন ‘দুজুয়ান’-এর আঘাতে জাপানে বিপর্যয় দুজনের মৃত্যু। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময়সূচি প্রকাশ ঢাকার সাবেক পুলিশ সুপারসহ ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত। পোরশায় মাদক সেবনের দায়ে যুবককে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিল ভ্রাম্যমাণ আদালত পূর্ণভবা নদীতে নৌকাডুবি: শিশুসহ ১০৯ যাত্রী নিয়ে নৌকাডুবির ঘটনা, সুতি জালের উপকরণের সঙ্গে ধাক্কা। 
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

জীবন্ত শিশুর মাথায় ছাদ নেই, অথচ রাষ্ট্রের কোটি টাকা ইট পাথরের স্থাপনায় — এ কেমন অগ্রাধিকার?

রিপোটারের নাম / ১৪১ বার পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

 

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু কতগুলো ভবন নির্মাণ হলো, কত টাকা ব্যয়ে কত বড় স্থাপনা তৈরি হলো কিংবা কত স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মিত হলো—তার ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো, সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকদের কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিতে পারছে।

 

আজ আমাদের শহরের ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, বাজার ও বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় এমন অনেক শিশু দেখা যায়, যাদের মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই। তাদের অনেকের রাত কাটে খোলা আকাশের নিচে, কখনো ফুটপাতে, কখনো কোনো দোকানের বারান্দায়, আবার কখনো পরিত্যক্ত স্থাপনার পাশে। দিনের আলোয় তারা মানুষের ভিড়ে মিশে যায়; কিন্তু রাত নামলেই তাদের অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

 

প্রশ্ন হলো—এই শিশুরা কি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়?

একদিকে আমরা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ইট-পাথরের স্থাপনা নির্মাণ করছি। ইতিহাস অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। একটি জাতির আত্মপরিচয়, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলতে হয়—ইতিহাসের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে যদি বর্তমানের জীবন্ত মানুষকে আমরা উপেক্ষা করি, তাহলে সেই উন্নয়নের মানবিক মূল্য কোথায়?

 

একটি জাদুঘরের ভবন আমাদের অতীতের কথা বলতে পারে। একটি স্মৃতিসৌধ আমাদের ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদে ঘুমিয়ে থাকা শিশু আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রের মানবিকতার পরিচয় দেয়।

ইট-পাথরের স্থাপনা কথা বলে না; কিন্তু একটি আশ্রয়হীন শিশু প্রতিদিন নীরবে রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রাখে।

 

তার প্রশ্ন—“আমার থাকার জায়গা কোথায়?”

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সমাজসেবী সংগঠন, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। পথশিশুদের পুনর্বাসন রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

শুধু খাবার নয়, দরকার নিরাপদ আবাসন

পথশিশুর হাতে একবেলা খাবার তুলে দেওয়া মানবিক কাজ। কিন্তু খাবার দিয়ে তাকে আবার ফুটপাতে ফিরিয়ে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

একটি শিশুর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষা, মানসিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ। অর্থাৎ পথশিশুদের জন্য এমন আবাসিক পুনর্বাসন প্রকল্প দরকার, যেখানে একটি শিশু শুধু রাত কাটানোর জায়গা নয়—একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাবে।

 

সরকার চাইলে সরকারি জমি, পরিত্যক্ত সরকারি স্থাপনা কিংবা উপযুক্ত খাসজমি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। এসব কেন্দ্রে আবাসন ও খাবারের পাশাপাশি স্কুলে ভর্তি, কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জন্মনিবন্ধন, পরিবার শনাক্তকরণ ও পুনর্মিলন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

 

রাষ্ট্রের বাজেটে অগ্রাধিকারের প্রশ্ন

আমাদের সীমিত সম্পদের বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে উন্নয়ন, অবকাঠামো, ইতিহাস সংরক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই প্রশ্নটি কোনো স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি অগ্রাধিকারের ভারসাম্য নিয়ে।

 

একটি প্রকল্পে শত কোটি টাকা ব্যয় করার আগে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করা উচিত—

“এই অর্থের একটি অংশ দিয়ে কি আমরা শত শত শিশুর জীবন বদলে দিতে পারি?”

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে পরিকল্পনায় সেই মানবিক বিকল্পটিও বিবেচনা করা উচিত।

কারণ একটি ভবন নির্মাণ করলে একটি স্থাপনা দাঁড়ায়; কিন্তু একটি শিশুকে পুনর্বাসন করলে একটি জীবন দাঁড়িয়ে যায়।

 

ইতিহাস সংরক্ষণ হোক, শিশুর ভবিষ্যৎও নির্মিত হোক

আমাদের ইতিহাস আমাদের গর্ব। ইতিহাসের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হবে, জাদুঘর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে—ইতিহাস শুধু ভবনের দেয়ালে থাকে না; ইতিহাস তৈরি হয় মানুষের জীবনে।

 

আজ যে শিশুটি ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে, আগামী দিনের সেই শিশুই হতে পারে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, শিল্পী কিংবা দেশের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক। কিন্তু তার শৈশব যদি ক্ষুধা, অনিরাপত্তা, নির্যাতন ও রাস্তায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতায় হারিয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্র শুধু একটি শিশুকে নয়—সম্ভাবনাময় একটি ভবিষ্যৎকেও হারাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের একটি শিশু আগামীর জনসম্পদ , কিন্তু এই সম্ভাবনাময়ী শিশু নামক সম্পদগুলো কে এভাবে যদি রাস্তায় ফেলে রাখা হয় তাহলে এই শিশু গুলো বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকাসক্ত হয়ে দেশের সম্পদের চেয়ে দেশের ক্ষতিকারক হিসেবে গড়ে উঠবে, এবং এই শিশুগুলো কে বিভিন্ন দুষ্কৃতকারীরা খারাপ ব্যবহার করবে।

 

তাই রাষ্ট্রের উচিত পথশিশুদের সংখ্যা নিয়ে শুধু জরিপ না করে জাতীয় পথশিশু পুনর্বাসন নীতিমালা ও কার্যকর আবাসিক পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা।

প্রতিটি জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় পর্যায়ক্রমে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব কেন্দ্র পরিচালনা করা সম্ভব। নাগরিক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজকর্মীদেরও এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

 

একটি শিশুর মাথার ওপর ছাদ—এটিও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সূচক

আমরা উন্নয়নের নতুন নতুন সূচক তৈরি করি। মাথাপিছু আয়, জিডিপি, অবকাঠামো, সড়ক, সেতু—সবই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়নের আরেকটি সূচক হওয়া উচিত—

কতজন শিশুকে আমরা ফুটপাত থেকে নিরাপদ ঘরে নিয়ে যেতে পেরেছি?

কতজন শিশুকে আমরা স্কুলে ফিরিয়ে দিয়েছি?

কতজন শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করেছি?

কতজন শিশুকে নির্যাতন, মাদক ও অপরাধের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করেছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও রাষ্ট্রের উন্নয়নের হিসাবের অংশ হওয়া উচিত।

 


এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

;