বিশেষ প্রতিনিধি, সেনবাগ : নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের ৭ নং ওয়ার্ডের প্রায় আড়াই শতাধিক পরিবারের ভাগ্য এখন প্রশাসনের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকে আছে। ঐতিহ্যবাহী ‘শেখ সূফি খাল’-এর শাখা খালটি দখলমুক্ত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত স্মারকলিপি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। কিন্তু সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড কর্তৃক অবৈধ দখলদারদের একটি তালিকা তৈরির পর পুরো প্রক্রিয়াটি অলস পড়ে আছে। প্রশাসনের এমন ধীরগতির কারণে একদিকে যেমন ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে আসন্ন বর্ষায় বড় ধরনের জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে পুরো এলাকার মানুষ।
উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি, তবুও মেলেনি কার্যকর সুরাহা এলাকার জলবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শেখ কামালের নেতৃত্বে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের শীর্ষ মহলে দফায় দফায় ধড়না দিয়েছেন।
এই শাখা খালের এই সংকটাপন্ন অবস্থা তুলে ধরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে:
মাননীয় উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
মহাপরিচালক (ডিজি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা
নির্বাহী পরিচালক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নোয়াখালী
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), সেনবাগ
সহকারী কমিশনার (ভূমি), সেনবাগ
এতগুলো দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ার পর সেনবাগ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে নড়েচড়ে বসা হয়। তারা খালের ওপর নির্মিত বাড়ি-ঘর ও অবৈধ স্থাপনার একটি সরেজমিন তালিকা (ইনভেন্টরি) তৈরি করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠান। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ওই তালিকা প্রস্তুত করার পর দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও উচ্ছেদ বা খাল খননের বিষয়ে দৃশ্যমান আর কোনো অগ্রগতি বা আপডেট মেলেনি।
কেন থমকে আছে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া?
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৪ কড়ির এই বিশাল খালটি এখন কোথাও ৪ বা ৫ কড়িতে এসে ঠেকেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তালিকা হওয়ার পর অজ্ঞাত কারণে ফাইলটি লাল ফিতায় বন্দি হয়ে আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নাকি কোনো অদৃশ্য মহলের চাপ—কোন কারণে এই জনগুরুত্বপূর্ণ কাজটি আটকে আছে, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মনে নানা প্রশ্ন দানা বাঁধছে।
খালের ওপর বাড়ি-ঘর ও রাস্তা বানিয়ে পানি চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখায় আড়াইশ পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসাগামী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পানি সরার বিকল্প কোনো পথ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা নোংরা পানিতে তলিয়ে যায়।
আইনি লড়াই ও গণদাবির মুখে প্রশাসন
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শেখ কামাল জানান, “বিষয়টি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিক। আমরা আইনি ও প্রশাসনিক সব পথ অবলম্বন করে স্মারকলিপি দিয়েছি। এসি ল্যান্ডের তালিকা জমা হওয়ার পর প্রশাসনের উচিত ছিল দ্রুত উচ্ছেদ নোটিশ ইস্যু করা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দ করে খালটি খনন করা। কিন্তু এর পর আর কোনো আপডেট না থাকাটা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা আশা করি প্রশাসন দ্রুত এই অচলাবস্থা ভাঙবে।”
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং খালের জমি উদ্ধার করতে স্থানীয়ভাবে গঠিত ‘খাল সংস্কার ও পুনরুদ্ধার কমিটি’র আহবায়ক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন (আর্মি বেলাল) এবং যুগ্ম আহবায়ক খোরশেদ আলমও প্রশাসনের এই রহস্যজনক নীরবতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জনগণের দাবি ও প্রত্যাশা:
স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের একটাই দাবি—কাগজে-কলমে তালিকা করার নাটক বন্ধ করে অনতিবিলম্বে সেনবাগ উপজেলা প্রশাসন ও নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথ অভিযানের মাধ্যমে খালের অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিক। ২৪ কড়ির এই প্রাচীন সরকারি খালটি পুনরুদ্ধার করে আড়াইশ পরিবারকে কৃত্রিম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।